ব্যস্ত সময় পার করছেন মানিকগঞ্জের নৌকার কারিগররা

নিজস্ব প্রতিবেদক : শুষ্ক মৌসুমে নৌকার কদর না থাকলেও বর্ষা আসতে না আসতেই এর চাহিদা যেন বেড়ে যায় শতগুন। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের মানুষের কাছে নৌকা যেন মৌলিক চাহিদার একটি অংশ হয়ে দাড়ায় বর্ষাকালে। এ বছর মানিকগঞ্জের নৌকার কারিগররা একটু আগেভাগেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বর্ষাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নৌকা ও ডিঙ্গী নৌকা তৈরীর মহোৎসব।

এখন আগের মতো বড় নৌকা তৈরী না হলেও ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা তৈরীতে যেন কোন ঘাটতি নেই। বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারনে মিস্ত্রিরা কাজের সন্ধানে বাইরে না বেরুতে পেরে এ বছর বর্ষার পূর্বেই তারা অন্য কাজ রেখে নৌকা তৈরীর কাজে যুক্ত হয়েছেন। পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী এ বছর পানি অনেক বেশি হবে। এই আশায় বুক বেঁধে দুটো পয়সা পাওয়ার জন্য তারা দিবা নিশি নৌকা তৈরীর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। জেলায় আরো দুই সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হযেছে নৌকা বিকিকিনি। সাইজ ও মান ভেদে নৌকার দামও বেশ ভাল।

জানা গেছে, মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলার মধ্যে ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর ও শিবালয় তুলনামূলক নীচু এলাকা। পানি একটু বেশি হলেই ডুবে যায় চারপাশ। যার কারনে বর্ষাকালে এই চারটি উপজেলায় নৌকার চাহিদা অনেক বেশি। কাঠ ও মান ভেদে বর্তমানে ১১ হাত একটি ডিঙ্গি নৌকা বিক্রি হচ্ছে চার হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। প্রতি বছরই দামের এ সীমা উঠা নামা করে পানির মাত্রার সাথে। পানি যদি হু হু করে বেড়ে যায় নৌকার চাহিদাও বেড়ে যায় অনেক গুন। সঙ্গে সঙ্গে নৌকার দাম দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বেড়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেক নৌকার কারিগর বেশ লাভবান হন। কিন্তু বিধি যদি বাম হয় তখন লাভের বদলে তাদের কষতে হয় লোকসানের হিসাব। হঠাৎ পানি বেশি হলে অনেক মিস্ত্রি তাদের অন্যান্য কাজ গচ্ছিত রেখে ধারদেনা করে কাঠ কিনে শুরু করেন নৌকা তৈরীর ব্যবসা।

২০১৯ সাল ছিল মিস্ত্রিদের জন্য এ রকম একটি বছর। গত বছর পানি বেড়ে হঠাৎ দুএকদিনের মধ্যেই কমে যায়। কমে যায় নৌকার চাহিদাও। দেখা দেয় নৌকার দর পতন। তখন নৌকার বাজার ছিল না বললেই চলে। এমতাবস্থায় কাঠ মিস্ত্রিরা তখন পড়ে যান বিপাকে। নৌকা বিক্রি না থাকায় তখন তাদের রুটিরুজি বন্ধের পথে। তাদের নিজেদের কাছে গচ্ছিত যৎসামান্য অর্থ প্রায় শেষ। ঋণের টাকায় তৈরী নৌকা অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে ছিল মুখ থুবরে। এখন তাদের মাথার উপর খর্গ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঋণের বোঝা। ঘরে না ছিল খাবার, না ছিল টাকা। বিভিন্ন সমিতির লোক সাপ্তাহিক কিস্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিল প্রতিনিয়ত। এ কারনে মানিকগঞ্জের নৌকার কারিগররা গত বছর পড়েছিল মহাবিপদে।

উপজেলার কলাগাড়ীয়া গ্রামের নৌকার কারিগর বিমল মিস্ত্রী বলেন, তিনি মূলত একজন নৌকার কারিগর। কিন্তু এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং পর্যাপ্ত পানি না হওয়ায় তিনি নিজ মূলধন খাটিয়ে এ কাজ প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। এখন তিনি রোজ হিসেবে অন্যের নৌকা তৈরী করে দেন। এতে তার আয় কম হলেও ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

ঘিওর উপজেলার রামদিয়া নালী এলাকার গোপাল মিস্ত্রী বলেন, এ বছর একটু আগে আগেই নৌকা তৈরী শুরু করে দিয়েছি। একশোর মত নৌকা বিক্রিও হযেছে। এ বছর নৌকার দাম বেশ ভাল। কাঠ, লোহা ও মিস্ত্রী খরচ বাদে নৌকা প্রতি পাঁচশো থেকে এক হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। পানি যদি তুলনামূলক বেশি হয় তবে নৌকার দাম আরেকটু বাড়তে পারে।

ঘিওর হাটের নৌকার বেপারি মুন্নাফ মিয়া বলেন, আমি হাটের অবিক্রিত নৌকাগুলো ঝুঁকি নিয়ে ক্রয় করি। সময় সুযোগ বুঝে লাভে বিক্রি করি। আমার কাছে গত বছরেরও কিছু নৌকা গচ্ছিত আছে। এ ব্যবসায় কিছুটা লাভ হলেও বেশ মূলধন আটকে থাকে।

হরিরামপুর উপজেলার আন্দারমানিক গ্রামের বাবুল হোসেন জানান, তিনি ঝিটকা হাট থেকে চাম্বল কাঠের সাড়ে দশ হাত একটি ডিঙ্গি নৌকা চার হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করেছেন। লোহা, মিস্ত্রী, আলকাতরাসহ প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ পড়বে। তিন বছর চালানো যাবে কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার।

বাবুল হোসেন আরো বলেন, আগের সেই কাঠ, আলকাতরা ও দক্ষ মিস্ত্রী না পাওয়ার ফলে এখনকার নৌকাগুলো টেকসই হয় না।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা জনাব মামুন হাওলাদার বলেন, নৌকা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে গেলে পানির কোন বিকল্প নেই। জলবায়ূ পরিবর্তনের জন্যই মূলত আমাদের দেশে পানি কম হচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত পানি না হলে শুধূ নৌকা কেন, সার্বিক দিক দিয়ে আমরা ক্ষতিগস্থ হবো। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে এ সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

Facebook Comments Box
ভাগ